গল্প

দক্ষিণী উপদেবতা ও ভূত-কলা

কলমে – Prianxi মৌ 

কেরালার গুরুভায়ুর মন্দিরে একধরণের নৃত্যকলা প্রদর্শিত হয় যার নাম কৃষ্ণাট্যাম। নৃত্যনাট্যের আঙ্গিকে প্রদর্শিত এই নৃত্যশৈলীর মাধ্যমে আটটি পর্যায়ে শ্রীকৃষ্ণের জীবনগাথা অভিনয় করে দেখানো হয়। উত্তর কেরলের মন্দিরে প্রচলিত এই নৃত্যশৈলীর থেকেই পরবর্তী কালে জন্ম হয় কেরালার বিখ্যাত কথাকলি নৃত্যের। কথাকলির জন্ম-বৃত্তান্ত নিয়ে যে কাহিনীটি শোনা যায় সেটি হলো – কেরলের কোট্টারাক্কার রাজা কেরল বর্মা একবার উত্তর কেরলের ছামুরি  বা ঝামুরি অঞ্চলের ধর্মীয় নৃত্য কৃষ্ণাট্যাম প্রদর্শনের জন্য ছামুরিরাজ মানদেবকে সসম্মানে তার রাজ্যে আহ্বান জানান। কিন্তু মানদেব সদম্ভে সে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেন তাঁর প্রবর্তিত এই নৃত্যশৈলী বাজার মত সমঝদার সারা দক্ষিণভারতে নেই। খুব স্বাভাবিক ভাবেই অপমানিত ও ক্রুদ্ধ  হলেন কেরল বর্মা। কোথায় বলে – কম , ক্রোধ , লোভ , মোহো , মদ্ , মাৎসর্য এই ষড়-রিপুর তাড়ণায় মানুষ অনেক নেতিবাচক  কাজ করে ফেলে।  তবে মাঝে মাঝে অনেক ইতিবাচক কাজও করেন।  এক্ষেত্রেও তাই হলো। দ্বিতীয় রিপুর দ্বারা তাড়িত হয়ে রাজা কেরল বর্মা উদ্যোগী হলেন রাজা মানদেবের দর্প চূর্ণ করতে , আর তারই পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম হলো কৃষ্ণাট্যামের অনুরূপ এক নৃত্যশৈলীর , যাতে কৃষ্ণের বদলে রামের জন্মকথা নৃত্যাভিনয়ের মাধ্যমে প্রদর্শিত হতে লাগলো।  

গুরুভায়ুর মন্দিরে প্রদর্শিত কৃষ্ণাট্যাম ( photo taken from wikimedia )

কৃষ্ণাট্যাম প্রদর্শিত হতো মন্দিরে দেব-বিগ্রহের সামনে পূজা-পার্বণে। তাই তার দর্শক সংখ্যা ছিল নির্দিষ্ট বা অনেকাংশেই সীমিত। কিন্তু এই নূতন উদ্ভাবিত নৃত্য-নাট্য পরিবেশিত হতে লাগলো পথে প্রান্তরে জনসাধারণের সামনে। যার ফলে কার্যতই এর দর্শক সংখ্যা ও জনপ্রিয়তা দুইই দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেতে লাগলো। লোকমুখে এই নাচের নাম হলো “ কথাকলি “ – কথা অর্থাৎ কাহিনী আর কলি অর্থাৎ নাট্যাভিনয়।

photo – Krishnattyam at Guruvayur Temple ( from Wikimedia commons ) 

অনেকটা একই ধরণের একটি নৃত্যশৈলী  উত্তর কেরলের কাসারগড় এবং কর্ণাটকের মালেনাড়ু অঞ্চলে বসবাসকারী টুলুভাষী দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে দেখা যায়।  উত্তর কেরলের এই ভূমিপুত্ররা আক্ষরিক অর্থেই প্রকৃতির সন্তান। বনজ সম্পদই তাদের জীবনধারণের মূল রসদ , তাই এই প্রকৃতিজ সম্পদ তাদের কাছে সাত রাজার ধনের সমান। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাদের সমাজে কিছু লৌকিক দেব-দেবী , উপদেবী / উপদেবতার পুজোর প্রচলন আছে।  বনের কোনো পশু-পাখি বা জন্তু-জানোয়ারের রূপ ধরে ইষ্টদেবতা তাদের  বিভিন্ন বিপদ আপদে রক্ষা করবে – এমন একটা প্রাথমিক ধারণা থেকেই সম্ভবত জন্ম হয়েছে এই সব দেব-দেবীর। তাই এই সমস্ত উপদেবতাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই দেখা যায় তাদের মুখটা কোনো এক বন্যা প্রাণীর মতো এবং শরীরটা মানুষের মতো। যেমন “পাঞ্জুরলি” বা বন্য শুকররূপী উপদেবতা , “নেলাউল্লা” নামক ভয়ঙ্কর সর্পরূপী দানবীর গর্ভজাত “গুলিগা “ বা ক্ষেত্রপাল, জুমাদি বা অর্ধনারীশ্বর উপদেবতা , মন্ত্র দৈবা বা মন্ত্রদেবী প্রভৃতি। 

পানজুরলি (শূকর আত্মা দেবতা) রূপী নৃত্যশিল্পীর মস্তক, এলএএসিএমএ আঠারো শতক ( photo source – wikipedia ) 

উত্তর কেরলের ভূমিপুত্র এই টুলুভাষী দ্রাবিড় উপজাতিভুক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত এই উপদেবী-দেবতারদের পুজোর মধ্যে একধরণের ধর্মীয় আচার দেখতে পাওয়া যায় যাকে ভূত-কোলা বা ভূত-কলা বলা হয়।  এখানে  “ভূত “ অর্থে আত্মা – এক্ষেত্রে উপদেবতাদের আত্মা , আর আঞ্চলিক উচ্চারণে “ কোলা “ বা কলার অর্থ শিল্পকলা বা নাট্যাভিনয়। সাধারণত নির্দিষ্ট পরিবার থেকেই বংশপরম্পরায় ভূতকলা শিল্পীদের নির্বাচন করা হয়।  যেসব বাড়িতে ওই নির্দিষ্ট দেব/দেবীর পূজার আয়োজন করা হয় সেবাড়িতে তাদের ডাক পড়ে। তারা মুখে রং মেখে , তাতে নানা চিত্র-বিচিত্র নকশা এঁকে ওই দেবতাদের অনুকরণে সাজসজ্জা করে অনেকটা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় প্রচলিত ছৌ-নাচের মতো । বিভিন্নরকম “ টেম্পেল জুয়েলারি “ ছাড়াও তালপাতা চিরে বানানো এক ধরণের ঘাঘরা তাদের সাজ-পোশাকের অঙ্গ। পুজোর মধ্যে নির্দিষ্ট সময় এই উপদেবতা রূপে সজ্জিত শিল্পী নাচতে থাকে বাজনার তালে তালে।  বিশ্বাসীরা মনে করেন এইভাবে নাচতে নাচতে তাদের দেহে ওই নির্দিষ্ট দেবতার আবির্ভাব হয় , অনেকটা আত্মার দেহধরণের মতো।  গ্রামবাংলায় প্রচলিত অর্থে যাকে দেব/দেবীর “ ভর হওয়া” বলাহয় , এও ঠিক সেই রকম।  এই অবস্থায় তাদের কাছে ভক্তেরা নানান সমস্যার কথা জানান প্রয়োজনীয় সমাধানের আশায়। ক্ষেত্রপাল বা গুলীগার কাছে জানান জমিজমা সংক্রান্ত বিবাদ বা অমীমাংশিত মামলা মোকদ্দমার কথা, মন্ত্রদেবীর কাছে জানানো হয় বাড়ির কোনো সম্পদ চুরি হলে , গ্রাম্য মানুষেরা বাড়ির গাছের নারকেল, তাল চুরি হলেও মন্ত্রদেবীর পূজা ও “ ভূত-কলা” করান যাতে চোরের শাস্তি হয়।  সম্প্রতি একটি দক্ষিণী সিনেমা – “কান্তারা“ 

( #KANTARA ) বেশ সাড়া জাগিয়েছে কেরলের এই প্রচলিত লোকাচার নিয়ে ।  এতে বন্যশুকর রূপী পানজুরুলি দেবতা এবং গুলিগা বা ক্ষেত্রপাল কথা দেখানো হয়েছে। যারা ঈশ্বরে এবং সর্বোপরি অলৌকিকে বিশ্বাস করেন তারা এসব নিয়ে কোনো প্রশ্নই তুলবেন না খুব স্বাভাবিক।  তবে যাঁরা এই প্রচলিত প্রথা গুলিকে নেহাতই কুসংস্কার বা কু-প্রথা বলে উড়িয়ে দেবেন তারা একটু দৃষ্টি ভঙ্গি বদল করে দেখলে বুঝতে পারবেন – সমাজে এইসমস্ত তথাকথিত “ কুপ্রথা “ গুলির প্রচলন কেন হয়। দরিদ্র ও নিপীড়িত নিম্নবর্ণের ভূমিপুত্রেরা যখন উচ্চবর্ণের ক্ষমতাশালী মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে শোষিত হতে হতে দেয়ালে পিঠ থেকে যায় , প্রতিবাদের ইচ্ছে থাকলেও সাহস বা সঙ্গতি থাকে না , তখন তাদের মনের ভয় ও  দৈবের প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাসের থেকে জন্ম নেয় এই সমস্ত লৌকিক উপদেবতার।  

গুলিগা photo taken from wikimedia commons , uploaded by Vishwanatha Vadikana 

ব্লগের সঙ্গে দেয়া প্রথম ছবিটি  উত্তর কেরালার কুন্নুরের মাথেমঙ্গলমে অবস্থিত ভদ্রকালী মন্দিরে আয়োজিত থাইয়ামের ভাসুরিমালা উপদেবীর । এই থাইয়ামে ভাসুরিমালা নামক এই উপদেবী স্মল পক্স , চিকেন-পক্স প্রভৃতি ছোঁয়াচে রোগের উপদেবী হিসেবে পূজিতা হন , গ্রাম-বাংলায় যেমন মা শীতলা অনেকটা সেই রকমই । উত্তর কেরলের প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী একবার শিবের তৃতীয় নেত্রের রোষানল থেকে জন্ম হয় মা ভদ্রকালী ও দ্বারিকান নামক এক অসুরের। ভদ্রকালীর কাছে যুদ্ধে পরাজিত দ্বারিকানের স্ত্রী মানোদারী প্রতিশোধ নিতে পূজার্চনার দ্বারা শিবকে তুষ্ট করে তার শরীরের ঘাম নিয়ে এসে ছিটিয়ে দেন , ভদ্রকালী রোগাক্রান্ত হন এবং পরে বিবাদ মিটলে তিনি মানোদরীকে তাঁর সহচরী রূপে গ্রহণ করেন , তার নাম হয় ভাসুরিমালা। 

এসবই প্রচলিত “মিথ” , আর অনেকে মনে করেন মিথ মানেই মিথ্যে।  যাক সেসব বিতর্কের বিষয়।  এখন হয়তো পরিস্থিতি বদলেছে তবে একটা শোয় ছিল যখন নিম্নবর্ণের এই উপজাতিদের সাধারণ রোগবালাইয়ের চিকিৎসার মতো আর্থিক সঙ্গতি ছিল না , তখন তাদের কাছে দৈবই ছিল একমাত্র ভরসা , আর সেই ভরসার থেকে জন্ম নিতো এই ধোনের উপ-দেবী ও উপ-দেবতাদের। তবে যাই হোক “ কান্তারা “ সিনেমাটিতে দেখানো এই উপদেবতাদের মাধ্যমে কিন্তু কেরলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এই নৃত্যশৈলী গুলির কথা আরো বেশি সংখক মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।   

All photos are taken from wikimedia .Photo of “Kali Theyyam “ was uploaded by Sumanlkv ,Bhoota-kola of Panjuruli Daiva was uploaded by Ashyvb ( wikimedia commons ) Third photo of bhoota-kola also taken from wikimedia common .