রান্না-বান্না ঘোরাঘুরি ও আটপৌরে জীবনের গল্প

ঘটি বাড়ির ” রান্নাপুজো ” বা অরন্ধন

পশ্চিমবঙ্গের বহু পরিবারে ভাদ্র মাসের শেষদিন বা সংক্রান্তিতে আর শ্রী পঞ্চমীর পরের দিন বা শীতল ষষ্ঠীর দিন অরন্ধন পালন করা হয়। কোনো কোনো জায়গায় আবার দশহরা এবং শ্রাবন মাসের সংক্রান্তিতেও অরন্ধন পালন করা হয়।

শীতল ষষ্ঠীর অরন্ধনে গোটামুগডাল ও জোড়া গোটা সব্জি দিয়ে গোটা সিদ্ধ বানানো হয় | বিভিন্ন বাড়িতে বিভিন্ন ভাবে এই গোটা-সেদ্ধ প্রস্তুত করা হলেও চরিত্রগত ভাবে একটা মিল আছে। সেটা হল এতে খোসা সুদ্ধ গোটা মুগ ডাল, গোটা সবজি এবং শিষ পালং ব্যবহৃত হয়। এই সব্জি গুলো আবার একই বোঁটায় দুটো করে আছে এমন দেখে নির্বাচন করা হয় , অর্থাৎ জোড়া বেগুন , জোড়া শিম প্রভৃতি | সঙ্গে শুকনো ডাল বা ডাল চচ্চড়ি , কুলের অম্বল বা চাটনি আর পায়েস | এই দিনের রান্নার মধ্যে কোনো আমিষ পদ থাকে না | সঙ্গে অবশ্যই পান্তা ভাত | এই দিন বাটনা বাটার শীল ও নোড়া লাল- হলুদ কাপড় দিয়ে সাজিয়ে শীতলষষ্ঠী রূপে ফুল মালা দিয়ে পুজো করে এই ভোগ নিবেদন করা হয় | পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে “এদেশীয়” বা ঘটিদের বাড়ি শ্রীপঞ্চমীর পরের দিন এই অরন্ধন পালন করা হয় |

তবে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন যে অরন্ধন পালিত হয় তা রান্নাপুজো বলে পরিচিত | সাধারণত আগের দিন রাতে ভাত রান্না করে তাতে জল ঢেলে পান্তা করা হয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন রকমের ভাজা আর তরকারি খাওয়া হয়। তবে সে সবই আগের দিন রান্না করা। কারণ পরের দিন বা মনসা পুজোর দিন বাড়িতে উনুন জ্বলানো হয় না কারণ সেদিন অরন্ধন পালিত হয় | ভাদ্র মাসের অরন্ধনকে আমাদের বাড়িতে “রান্না পুজো” বলা হয়। এই দিন মনসা পুজো করা হয় মাটির উনানে |

আগে যখন মাটির উনুনে রান্না হত তখন দেখতাম প্রথমে ভাত রান্না করে তাতে জল ঢালা হত, এর পরে একে একে পাঁচ রকম ভাজা, নারকেল ও ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচু শাক,

ইলিশ মাছের মাথা আর পুঁইশাক দিয়ে ছেঁচড়া , নারকেল কোৱা দিয়ে চালকুমড়োর ছেঁচকি , শুকনো ডাল বা ডাল চচ্চড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা, ইলিশ মাছের টক ও চালতার অম্বল |

প্রসঙ্গত বলে রাখি , এই ছাঁচি কুমড়োর ছেঁচকিতে চিরাচরিত পদ্ধতিতে ডুমো করে আনাজ কাটা হয় না | তার বদলে ঝুরো আলুভাজার মতো ঝিরিঝিরি করে ছাঁচি কুমড়ো কেটে সর্ষের তেলে সর্ষে আর কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে তাতে কুচোনো আনাজ দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢাকা দেওয়া হয় | কুমড়োর জলে কুমড়ো সেদ্ধ হলে পরিমান মতো নুন চিনি দিয়ে শুকনো শুকনো হয়ে এলে তাতে নারকেল কোৱা ছড়িয়ে নামিয়ে রাখা হয় | এই রান্নাটায় হলুদ দেওয়া হয় না |

রান্না করে উনুন থেকে নামিয়ে কলাপাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। সবার শেষে হয় পায়েস বা পরমান্ন। পরমান্ন উনুন থেকে নামানো হলে শাঁখে ফুঁক পড়ে । যিনি গৃহদেবতার নিত্যপূজা করেন সেই পুরোহিত ঠাকুর পরমান্ন রান্না করেন এবং সব রান্না হয়ে গেলে শাঁখ বাজিয়ে জানান দেওয়া হয় যে রান্না শেষ হয়েছে। #prianxi ©️


এবার সব রান্না শুদ্ধাচারে ভিজে সাদা মলমল বা আর্দ্দির কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় । খুব ভোর বেলা ওই উনুন নিকিয়ে তাতে চাল গোলা বা পিটুলি দিয়ে বিজোড় সংখ্যার (৫ বা ৭ টি ) সাপ এঁকে তাতে শালুক বা শাপলার মালা পড়ানো হয়।এই মালার বৈশিষ্ট্য হল একে হতে হবে বিনি সুতোর মালা। অর্থাৎ সুতোর বদলে এক একটা শালুকের ডাঁটি বা নাল থেকে আঁশ ছাড়িয়ে (না ছিঁড়ে) সেই আঁশ দিয়ে গিট বেঁধে বেঁধে এই মালা গাঁথা হয়। এবার তার ভিতরে একটা ফনিমনসার গাছ বা ডাল বসিয়ে তাকে ফুল মালা সিঁদুরে সাজিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয় ।

আজকের দিনে যদিও আর মাটির উনুনে রান্না করা হয়না , তবে এখনো রান্না পুজোর দিন সাবেক নিয়ম অনুযায়ী মাটির উনুন পুজো করার রেওয়াজ আছে। বাকি সব নিয়ম শুদ্ধাচারে পালন করা হয় |

এই অরন্ধন প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। রামচন্দ্রের অকাল বোধনের মতোই বিংশ শতকের শুরুর দিকে একবার চিরাচরিত প্রথার বাইরে গিয়ে আশ্বিনের সংক্রান্তিতে অরন্ধন পালন করা হয় এই বাংলার ঘরে ঘরে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কারণে শোকস্তব্ধ হয়ে এই অরন্ধন পালন করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে রাখি বন্ধন উৎসবও পালিত হয়েছিল।

🔴 লেখাটা পুরোনো , চার বছর আগে “পুরোনো কলকাতার গল্প” গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম |