Uncategorized

বাঙালির আচার-বিলাস

” ছাতের ঘরে আমের আচার
ফেরিওয়ালার ডাক …
কালবোশেখে শীল কুড়োনো
সন্ধ্যেবেলায় শাঁখ … “

মনে আছে ঋতুপর্ণ ঘোষের লেখা সেই বোরোলীনের জিঙ্গেল ?

ভাঁড়ার ঘরের আলো আঁধারির মধ্যে কাঠের জাল-আলমারির উঁচু তাকে থরে থরে সাজানো কমলাটে মোরব্বা, লালচে-কালচে গুড়-আম , হলদেটে আমতেল কুলের আচার-আমকাসুন্দি-মোরব্বা আমতেল জারকলেবুর জাঁকিয়ে বসা চীনমাটির বয়াম গুলোর ওপর জালনার খড়খড়ি দিয়ে এসে এসে পড়া নরম রোদ্দুর পুরোনো দিনের মানুষ গুলোর সাথে স্মৃতির অ্যালবামে ঢুকে গেছে অনেককাল আগেই।

তখন ছুটির দিনের নির্ঘুম দুপুর মানেই বাটিভর্তি আমের আচার , গুড়-আম আর কালো হয়ে যাওয়া জারক লেবু নিয়ে চিলে কোঠার ঘরে না হলে ছাদের কোণের বড় চৌবাচ্চাটার নীচে বসতো আমাদের দ্বিপ্রাহরিক বৈঠক | আজকের নাগরিক-জীবনের কৃত্রিমতার চাপে সেই সহজ সরল শৈশব হারিয়ে গেছে কবেই।

খাওয়া দাওয়ার পরে পড়ন্ত দুপুরে গা-ধুয়ে শুদ্ধ-সূচী হয়ে বাড়ির গিন্নিরা আচারের জোগাড়ে বসতেন, নানান রকম মেয়েলি গল্পের সাথে সাথে বঁটি দিয়ে কাটা কাঁচাআমের নিখুঁত টুকরোগুলো শিলাবৃষ্টি মত টুপটাপ গিয়ে পড়ত পাশে রাখা পিতলের গামলায়।তারপর হতো তাদের গায়ে-হলুদ। এই নুন হলুদ মাখানো কাঁচা আমের টুকরো গুলো মেদিনীপুরের মাদুরের ওপরে দুতিনটে পুরোনো কাচা সুতির শাড়ি ওপরে বিছিয়ে রোদে শুকোতে দেওয়া হতো কয়েকদিন |
বেশ খানিকটা সর্ষের তেল আর শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করা পাঁচফোড়ন ,
গোটা ধনে আধা ভাঙা করে আর সামান্য কালো সর্ষের গুঁড়োনো ও অল্প হিং আর শুকনো খোলায় ভাজা কয়েকটা গোটা শুকনো লঙ্কা ওই রোদে শুকনো করা আমের টুকরো গুলোর সঙ্গে মিশিয়ে বয়ামে ভরে আবার কয়েকদিন রোদ খাইয়ে ভাঁড়ারে তুলে রাখা সারা বছরের জন্য |

তবে সব আচারের পদ্ধতিতো আর এক নয়, এই যেমন জারক-লেবু। আগেকার দিনে দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে মুখের রুচি চলে গেলে পুরোনো জারক-লেবু খেত যাতে খাবারে রুচি ফেরে | দিদিমা বলতো জারকলেবু যত পুরোনো হয় তত কালচে রঙের হয় আর “মন্দাগ্নি”র প্রতিকারে তা তত বেশি কাজ করে।

আমাদের চেনা জানা আচার গুলো ছাড়া অনেক নতুন ধরণের আচার কিনে আনা হতো দক্ষিণেশ্বরে গেলে | মন্দিরে ঢোকার তোরণের আগে রাস্তার বাঁদিকে অনেক গুলো আচার দোকান ছিল , যেখান থেকে গাজরের আচার , কচি বাঁশের আচার , এঁচোড়ের আচার , ডুমুরের আচার প্রভৃতি আনা হতো |

পুরোনো দিনের সব কিছুই ভালো ছিল আর এখনকার সব খারাপ – এমন নয় , কিন্তু গরম ভাতে ঘি সঙ্গে বেসনে ডুবিয়ে পাট শাক ভাজা বা পলতা পাতার বড়া কিংবা পুঁইশাক-মাছের মাথা দিয়ে তৈরী ছ্যাঁচড়া , তিতার ডাল , ভাঙাচোরা শুক্তোর মতো হারিয়ে যাওয়া পদ যখন স্বমহিমায় ফিরে এসেছে আবার , তখন বাঙালির আচার-বিলাস কি আবার ফিরে আসতে পারে না ?