Uncategorized

শ্রীচৈতন্যের প্রিয় সুকুতা বা শুক্তো – বাংলার একটি প্রাচীন পদ

সেই কোন কাল থেকে চলে আসছে শুক্তোর সঙ্গে ভেতো বাঙালির প্রথমপাতের রোম্যান্স | ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে গাওয়া-ঘি এর পরেই আসতো তেতোর পালা | 

“ভোজনে বসিলা আসি যত বন্ধুজন।

খুল্লনা কনক থালে যোগার ওদন ॥

সুবর্ণের বাটীতে দুবলা দিল ঘি ।

হাসিয়া পরশে রামা বণিকের ঝি ॥

প্রথমে সুকুতা ঝোল দিল ঘণ্ট শাক ।

প্রশংসা করয়ে সভে ব্যঞ্জনের পাক ॥

দীনেশচন্দ্র সেনের লেখা কবিকঙ্কন-চন্ডীর সওদাগর উপাখ্যানে খুল্লনা তার সহচরী দুর্বলাকে সঙ্গে নিয়ে শুক্তো বানায় | প্রথমে বেগুন, কুমড়া, কাঁচকলা সঙ্গে বাটনা ও পিঠালি মিশিয়ে কাঠি দিয়ে ঘন ঘন নেড়ে তারপর তা গব্যঘৃতে হিং, জিরা, মেথি ফোড়ণ  দিয়ে পরিপাটি করে সাঁতাল দেয় | মধ্যযুগীয় সাহিত্যে যেমন ধর্মমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল বা পদ্মপুরাণের ভোজন তালিকায় শুক্তা, সুকুতা বা শুকতুনি ছিল। 

‘আয়ুর্বেদ-সংহিতা’ , ‘ভাবপ্রকাশ’প্রভৃতি পুরোনো বইপত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করলেই জানা যায় প্রথমপাতে তেতো বা শুক্তো খাওয়ার কারণ | তিক্ত রস অগ্নি উদ্দীপক, আদা খাবারে রুচি বৃদ্ধিতে কার্যকরী এবং লঘুপাক কাচকলা যা কিনা আবার দেহে লৌহের ঘাটতি পূরণেও সাহায্য করে , সবে মিলে তৈরী  শুক্তো যে কেবল রুচিকরই নয়, স্বাস্থ্যের পক্ষেও ভালো।

বৈষ্ণবসাহিত্যের পাতায় পাতায় ভোজনরসিক শ্রীচৈতন্যের অতি প্রিয় নিরামিষ পদ গুলির যে নিখুঁত এবং রসসিক্ত বর্ণনা পাওয়া যায় , তার মধ্যে “ সুকুতা “ বা  শুক্তোর উল্লেখ আছে একাধিকবার | 

চৈতন্যচরিতামৃতের মধ্যলীলার তৃতীয় পরিচ্ছেদে পাওয়া যায় অদ্বৈত আচার্য্য মহাপ্রভুকে পরম যত্নে ভোজন করাচ্ছেন , আয়োজনের মধ্যে রয়েছে শালী ধানের অন্ন সহযোগে বিবিধ ব্যঞ্জন | যার মধ্যে আছে নিম-বেগুন ভাজা , পটল, কুমড়ো, মানকচু ও বড়ি সহযোগে চৈ ও মরিচ দিয়ে বানানো শুক্তো , বিভন্ন প্রকার বাস্তু শাকের তরকারি , মুগডালের সুপ্ , ফুলবড়ি, কুম্মাণ্ড ও মানচাকি ভাজা, মোচাঘন্ট , দুগ্ধকুষ্মাণ্ড বা দুধ কুমড়ো , মুগডালের বড়া, মাষবড়া, কলার বড়া …. আরো কত কি ! গুরুভোজনে শ্রীচৈতন্যদেবের আমাশয় হলে শুকুতা বা শুক্তো ভক্ষণে তার উপশম হতো | 

“ গুরু ভোজনে উদরে প্রভুর আম হঞা যায়

শুকুতা খাইলে আম হইবেক নাশ ॥

সেই স্নেহ মনে ভাবি প্রভুর উল্লাস।”

মহাপ্রভুর অন্যতম প্রিয় পদ শুক্তোর ব্যাপারে তাই চৈতন্যচরিতামৃতে পাওয়া যায় – 

‘শুকুতা বলিয়া অবজ্ঞা না করিহ চিত্তে

শুকুতায়ে যে প্রীতি প্রভুর নহে পঞ্চামৃতে।

মহাপ্রভু নীলাচল গেলে প্রতিবছর রথের সময় রাঘব পন্ডিতের বাল্য বিধবা ভগিনী দময়ন্তী দেবীর তত্বাবধানে রাঘব ভবন থেকে ঝোলায় করে প্রভুর প্রিয় খাদ্যদ্রব্য শ্রীক্ষেত্র পাঠানো হতো যাকে বলা হতো “রাঘবের ঝালি”। তার মধ্যে থাকতো –  খইয়ের মোয়া, শালিকা ধানের খৈয়ের নাড়ু, চিড়ার নাড়ু, বাদামের নাড়ু, ক্ষীরের নাড়ু, ধানিয়া মুহুরী নাড়ু, শুটিখন্ডের নাড়ু, গঙ্গাজল বা গঙ্গাজলি নাড়ু ,  আতপচালের মুড়ির মোয়া, আম কাসুন্দি, ঝাল কাসুন্দি , লেবু, তেঁতুল, আমসি, তেঁতুলের আচার, হরতকি, তিলের নাড়ু, আমসত্ব, আমলকি, তৈলমৰ আমতা, কর্পূর মরিচ, লবঙ্গ, এলাচ, আদা কাসুন্দি, লেবু কাসুন্দি, ঝাল কাসুন্দি, ইত্যাদি। সেইসময় নালিতা, নিম বা অন্য কোনও তেতো স্বাদের পাতা শুকিয়ে রাখা থাকত ভবিষ্যতে রান্নার জন্যে। এই শুকনো বা শুষ্ক তিতা পাটপাতার দেখা মেলে রাঘবের ঝলিতে – “পুরান শুকুতা” নামে।পরবর্তী কালে তিক্ত স্বাদ যুক্ত ব্যঞ্জন , বিশেষ করে নিমপাতা, পলতা পাতা, নালতে শাক, শিউলি পাতা , উচ্ছে প্রভৃতি দিয়ে পদ শুক্তো নাম আখ্যায়িত হয় |  শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও শুক্তা জাতীয় ব্যঞ্জনের উল্লেখ আছে। 

বৈষ্ণব সাহিত্য “কৃষ্ণাহ্নিক কৌমদী’ গ্রান্থে রাধাকৃষ্ণের প্রিয় খাবারের মধ্যে চালকুমড়োর শুক্তোর উল্লেখ পাওয়া যায়। শুধু চালকুমড়ার শুক্তোই বা কেন আরো বহুবিধ তিতো পদের উল্লেখ পাওয়া যায় রন্ধনপটীয়সী রেণুকাদেবী চৌধুরানীর রান্নার বইতে , যেমন – উচ্ছে আলু ছেঁচকি , উচ্ছে আলু বেগুন বড়ি বা ডালের চাপড়া দিয়ে তিতো ঘণ্ট , উচ্ছে আলুর সরষে বাটা ঝোল, উচ্ছে বেগুন , কচি ঝিঙে দিয়ে পাট শাকের শুক্তো , করলা ও উচ্ছের শুক্তো, কাঁচকলার খোসা আর ডালের চাপড়ের শুক্তো , ঘণ্ট শুক্তো , ঝিঙে শুক্তো , ডালের বড়ার শুক্তো , ঢুলা শাকের শুক্তো , তিলবাটা শুক্তো , দই উচ্ছে , নিম ঝোল , নিম বেগুন , পলতা পাতার শুক্তো , ডালের চাপড়া দিয়ে শুক্তো , পোস্ত আর সরষে বাটার তিতো শুক্তো , বেগুন ও উচ্ছের ডগা ভাজা , মটর ডালের বড়া দিয়ে চালকুমড়োর শুক্তো , মিষ্টি কুমড়োর শুক্তো ,  লাল শাকের শুক্তো ঝোল , শশার শুক্তো , শশার শুক্তো , শাপলার শুক্তো , নিম শিম বেগুনের শুক্তো , হেলেঞ্চার শুক্তো প্রভৃতি |

কোন কালে সেই খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে  কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখায় দেখা যায় স্বয়ং মহাদেব জগন্মাতা গৌরীকে সুচারুরূপে শুক্তো রাঁধার প্রক্রিয়া বর্ণনা করছেন –

“আজি গৌরি রাদ্ধিয়া দিবেক মনোমত ।

নিম শিম বেগুণে রান্ধিয়া দিবে তিত ।

সুকুতা শীতের কালে বড়ই মধুর ।

কম্মাণ্ড বার্তাকু দিয়া রান্ধিবে প্রচুর ॥

ঘৃতে ভাজি শুকতাতে ফেলহ ফুলবড়ি।

চোয়া চোয়া করিয়া ভাজহ পলাকড়ি ॥”

বাঙালির এহেন সুপ্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত পদকে অনেকে নির্দ্বিধায় পর্তুগিজদের দয়ার দান বলে মনে করেন | অধুনা শুক্তোয় ব্যবহৃত আলু পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে এসেছিল ঠিকই , তাই বলে বাঙালির ভাত-পাতের প্রথম প্রেমকে এমন অবলীলায় বিদেশীদের দান বলে ভাবা বোধহয় ঠিক নয় | মনে রাখতে হবে “আমাদের যাহা কিছু ভালো যাহা কিছু শুভ” তার সবটুকুই বিদেশীদের দান নয় |