Uncategorized

গরম রসগোল্লা আর নরম দানাদারের কিসসা

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে , আরো একটু বেশি বয়সে সে স্মৃতির সাতকাহন ডাইরির পাতায় লিখে রাখতে খুব ইচ্ছে করে | 

এই ‘ডকুমেন্টেশন’ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ত মূল্যহীন | কারণ আমাদের ছোটবেলায় অনেক কিছু ছিল না , যা ওদের আছে | স্মার্টফোন , আইফোন , ল্যাপটপ , ক্রোমবুক , এলেক্সা  এগুলো যাদের জীবনে অপরিহার্য , তারা কি বুঝবে  সপ্তাহান্তে একটা করে বাংলা আর হিন্দি সিনেমা দেখার জন্য সারা পাড়া কেমন একান্নবর্তী পরিবারের মতো একই বৈঠকখানায় চা সিঙ্গারার তুফান তুলতো ! 

Youtube খুললেই যারা হাজারো অডিও স্টোরি শুনতে পায় তারা কি বুঝবে আমরা শনিবারের বারবেলা বা বোরোলীনের সংসার শোনার জন্য কেমন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম !! 

আমাদের ছোটবেলায় বিনোদনের উপকরণ কম ছিল বলেই হয়তো এমন কথায় কথায় “বোর ” হয়ে যেতাম না |

গরমের ছুটিতে বইখাতা গুছিয়ে মামারবাড়ি যেতাম ছুটি কাটাতে | বিকেলের চা খাওয়ার পর্ব মিটলে মামীমারা রাতের খাবারের জোগাড়যন্ত্র করতে যেত |

আগেকার দিনে অনেক বাড়িতেই এমন লোকজন থাকতেন যাঁরা দেশগাঁয়ে নিজের ভিটে-মাটি ছেড়ে , স্ত্রী-সন্তানকে রেখে বড় শহরে আসতেন রুজি রোজগারের আশায় | কোনো বাড়িতে কাজ করতে করতে বাড়িরই একজন হয়ে উঠতেন |

আমার মামার বাড়িতেও এমন একজন মানুষ ছিলেন – জয়পাল মামা | মা-মাসি- মামাদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে এককালে তাই মায়ায় পড়ে আর দেশে ফিরে যায়নি , তাছাড়া ধর্মতলার এ.টি দাঁ এর দোকানে কাজ করত| সকালে ডাল ভাত আর একটা তরকারি করে দিয়ে , নিজে কোনো রকমে নাকে মুখে গুঁজে কাজে যেত , বিকেলে এসে রুটির আটা মেখে চা করে সবাইকে দিয়ে রুটি করতে বসত | আর ঠিক ওই সময় আমি দিদিমার পাশে শুয়ে শুয়ে দিদিমার ছোটবেলার গল্প শুনতাম আর সামনে দক্ষিণের বারান্দা দিয়ে রাস্তার ওপারে লক্ষণলাল হোটেলের রান্না ঘরে রুটি করা দেখতাম |

ঘর অন্ধকার , কাজেই আমাদের কেউ দেখতে পেতো না কিন্তু আমি নিবিষ্ট মনে দেখতাম দু জন লোক বড় গামলায় পা দিয়ে আটা ঠাসছে , তারপর দু জন লেচি কাছে , আর বেলছে | রুটি সেঁকাটা বেশ মজার , দুলে দুলে রুটি সেঁকছে আর পাশের এলুমিনিয়ামের নৌকায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে | একবার ডান পায়ে ভর দেয় তো একবার বাঁ পায়ে জোর দেয় |

রুটি হয়ে গেলে বড় মোটা লোহার কড়াইতে দুধ জ্বাল দেওয়া হতো | অনেক লোক রাতের খাবার খেয়ে চিনি দেওয়া ঘন দুধ খেত লাইন দিয়ে | ওই সময়ে পরের দিনের জন্য দৈপাতা হতো |
এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না , সে জায়গায় এখন পাঁচতারা হোটেল হয়ে গেছে |

আমাদের খাওয়াদাওয়া মিটলে প্রায় দিনই মামাদের ইচ্ছে হতো গরম রসগোল্লা খাওয়ার | জানবাজারের মোড়ে রঘুমমার মিষ্টির দোকান , পোশাকি না ত্রিনয়নী মিষ্টান্ন ভান্ডার | জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করা হতো রসগোল্লা নেমেছে কিনা , উনি উনুন থেকে নেমে জিরোচ্ছেন শুনে কেউ না কেউ গিয়ে ওনাদের আদর-যত্ন করে নিয়ে আসতো | তখনকার দিনে মাথাপিছু গুনে আনার ব্যাপার ছিল না , তাই যার যত গুলো ইচ্ছে খাওয়া হতো | ” আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিলো “- case হলে , আবার কেউ না কেউ দোকানে ছুটতো রসগোল্লা আনতে |
গরম আর তুলতুলে নরম … আহা … মনে করলেই জিভে স্বাদ পাই |

দিদিমার মুখে শুনেছি পেটখারাপ হলে নাকি গরম রসগোল্লা খেলে ঠিক হয়ে যায় | এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারব না বাপু , তবে পেটখারাপের রুগী সারাদিন কাঁচকলার ঝোল আর জল মুড়ি খেয়ে খেয়ে যখন হেজে মজে যেত তখন ওই নরম গরম দুঃখ-হরণ গোল্লা গুলো তাকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিত |

কখনো ৮ টার লোকাল মিস হয়ে গেলে ১০ টার লোকালের জন্য অপেক্ষা করতে হতো | কারণ , দশটায় নামতো গরম দানাদার | দানাদার কিন্তু গরম অবস্থায় অত কচকচে মুচমুচে থাকে না , যাকে বলে একেবারে ঘন রসে সিক্ত লালচে কড়াপাকের রসগোল্লা | একেই রেখে দিলে ওপরের ঘন চিনির রসের আস্তরণটা কেলাসিত হয়ে প্রকৃত দানাদারে রূপান্তরিত হয় | আমার ওই কচকচে দানাদার খুব খুব খুব ভালোলাগে |

দানাদার ছাড়াও ওই দোকানের রসমাধুরী মিষ্টি আর লেবুর বরফি সন্দেশ খুব পছন্দ ছিল | কিন্তু ওই যে কথায় বলে না – অভাগা যে দিকে চায় , সাগর শুকায়ে যায় | ঠাকুর দেবতার কল্যানে গুজিয়া দানাদার ধুঁকেধুঁকে টিঁকে গেলেও রসমাধুরী , লেবুরবরফি , প্যারাডাইস সন্দেশ এসব না ফেরার দেশে চলে গেছে |