Uncategorized

শতবর্ষের দোরগোড়ায় হোটেল ‘সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’


কলকাতা কর্পোরেশনের গায়ে লাগানো ঝাঁকড়া গাছটার আড়ালে ঢেকে যাওয়া সাইনবোর্ডটা খুঁজে পেতে একটু অসুবিধে হতে পারে। কিন্তু কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই আপনাকে দেখিয়ে দেবে – ‘ হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’।

হোটেলের দরজায় ঢোকার মুখে ডানদিকের দেয়ালের গায়ে টাঙানো রয়েছে লাল রঙের সাইনবোর্ড, লেখা ‘ হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম।| দোতালার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই চোখে পড়বে কালো  রঙের বোর্ডে দামসহ খাদ্যতালিকা | ডান দিকের ঘরগুলিতে টেবিল পাতা , খাবার ব্যবস্থা রয়েছে | আর বাঁ দিকে বেশ বড় খোলা বারান্দা। হোটেলের নাম – সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম? নাম শুনে একটু অবাক হতেই পারেন আপনি। আর হোটেলের বয়সও নাই নাই করে একশোর দিকে এগিয়ে চলেছে। ‘সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’ হল গিয়ে আপাদমস্তক বিশুদ্ধ বাঙালি খাবারের একটি জনপ্রিয় হোটেল। যা প্রায় শতবর্ষ আগে গড়ে উঠেছিল এখানে। এককথায় সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমকে এককথায় ‘খাবারের তীর্থস্থান’ বলা যেতেই পারে । তা একশো বছর আগে কে করেছিলেন এই খাদ্যাশ্রম? খোঁজ নিয়ে জানা গেল হোটেলের প্রাচীন ইতিহাস। হোটেলের জমিটি এখন রাণীমার মেজো জামাই প্যারীমোহন চৌধুরীর উত্তরসূরীদের ভাগে রয়েছে | বর্ধমান থেকে এসে  ক্ষুদিরাম সরকার, ১৯২৫ সালের আশপাশে জানবাজারের রানী রাসমণির বাড়ি সংলগ্ন জমির কিছুটা অংশ ভাড়া নিয়ে সেই জমির ওপরেই  গড়ে তুলেছিলেন এই ‘সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’ | একতলায় সেযুগে একটি মেস গড়ে উঠেছিল। গ্রাম-বাংলা ও জেলা-মফস্বল থেকে কলকাতায় চাকরি করতে আসা মানুষরা ওই মেসে থাকতেন। তাঁরা দুবেলা খেতেন এবং তাঁদের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখানে নিয়ম করে দুবেলা খেতে আসতেন। হোটেলটি তৈরি হয়েছিল সেবার আদর্শ নিয়ে অনেকটা আশ্রমের কায়দায় তাই নামের সঙ্গে জুড়ে গেছিল ‘আশ্রম’। নামমাত্র মূল্যে ঘরোয়া খাবারের  পাশাপাশি থাকার ব্যবস্থাও ছিল , তাই নাম হয় ‘সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’। ক্ষুদিরাম বাবুর দৌহিত্র শ্রীউমাপদ সেনের সময় থেকে এই হোটেল আরও জনপ্রিয়তা লাভ করে। শোনাযায় , তাঁদের আদি নিবাস বর্ধমান জেলায় প্রতিষ্ঠিতা দেবী সিদ্ধেশ্বরী কালীর নামানুসারেই এই হোটেলের নাম রাখা হয়েছিল ‘সিদ্ধেশ্বরী’। হোটেলটি তৈরি হয়েছিল সেবার আদর্শ নিয়ে অনেকটা আশ্রমের কায়দায় তাই নামের সঙ্গে জুড়ে গেছিল ‘আশ্রম’।

হোটেলটির প্রতিষ্ঠাতা ক্ষুদিরাম বাবুর দৌহিত্র উমাপদ সেনের পরে এই হোটেলের দায়িত্ব বর্তায় তাঁর সুযোগ্য পুত্র শ্রী সুজিত সেনের ওপর । এখন হোটেলের দায়িত্বে আছেন সুজিত বাবুর দিদি দেবযানী সেন ও স্ত্রী রীতা সেন।

প্রায় চার প্রজন্ম আগে তৈরি হোটেলটি এখনও তার ঐতিহ্যের পরম্পরা বহন করে চলছে ক্ষুদিরাম বাবুর সুযোগ্য উত্তরসূরীদের দক্ষ পরিচালনার গুনে এবং কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও আন্তরিক ব্যবহারে । এখন আর পান্থনিবাসের ব্যবস্থা নেই কিন্তু হোটেলের কর্মচারীরাই এখন সেই মেসের জায়গায় বসবাস করেন।‘সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমে’র সরু সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেই ডানদিকে ঘরের ভিতর ঘর, ওপরে কড়িকাঠের সিলিঙয়ে ঢিমেতালে ঘুরতে দেখা যায় সেই ব্রিটিশ আমলের বড় ডিসি ফ্যান, কাঠের বেঞ্চ আর মার্বেল টপের কাঠের টেবিল।

পাইস হোটেলের ঐতিহ্য মেনে হোটেলে ঢোকার মুখেই বাংলা এবং ইংরেজিতে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে খাবারের হরেক রকম পদ এবং তার মূল্য তালিকা দেওয়া রয়েছে | আগাগোড়া বাঙ্গালিয়ানা আর কি! আর বোর্ডের মাথায় দেখা যায় ‘গনেশ বন্দনা’। সিদ্ধশ্বরীতে সিদ্ধিদাতার নাম থাকবে না তা কখনও হয় নাকি !হোটেলের সদস্য ভগীরথ দাসের কথায়,  একেবারে  গোড়ার দিকে  খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল মাটিতে আসন পেতে, কাঁসার থালা, বাটি ও গ্লাসে। এখন সে ব্যবস্থা নেই কিন্তু দুবেলা হোটেল রয়েছে। আজও হোটেল জমজমাট। কাঁসার থালা-বাটি কিম্বা মাটিতে আসনের ব্যবস্থা এখন আর নেই। রয়ে গেছে সাবেকি ধাঁচের কাঠের চেয়ার-টেবিলে সেই বনেদি স্টাইলে খাওয়ার ব্যবস্থা।

স্টিলের থালার ওপরে কলাপাতা বিছিয়ে তাতে  খাবার পরিবেশন করা হয় আজকাল, সঙ্গে মাটির ভাঁড়ে জল | চাকরিজীবী অফিসপাড়ার লোকজন সহ নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষজন এখানে দুবেলা পেট ভরে খান। টেবিল পছন্দ করে বসলেই. কলাপাতা বসানো স্টিলের থালায় সেই সাবেকি রেওয়াজ মেনে আসে ভাত এবং মাটির ভাঁড়ে জল। তারপর ধোঁয়া ওঠা সরু চালের ভাতের সঙ্গে পরিবেশিত হয় শুক্তো , নারকেল দেওয়া ঘন মুগের ডাল , ঝুরি আলু ভাজা, আলু-পটল পোস্তর তরকারী , মাছের মাথা ও  শাক দিয়ে কাঁটা-চচ্চড়ি ও বিভিন্ন ধরণের মাছ ।

সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমের মাছের পদগুলি ভীষণ ভাবে জনপ্রিয় , যেমন -পাবদা মাছের সর্ষে বাটা দিয়ে ঝাল , পার্শে মাছের ঝাল, বড় গলদা চিংড়ির মালাইকারি , পমফ্রেট সহ আরও নানান পদ। তবে রোজের গ্রাহক অফিসবাবুদের কথা মাথায় রেখে বানানো হয় ‘ কবিরাজী ঝোল ‘ – আলু পেঁপে কাঁচকলা সহযোগে জিরেবাটা দিয়ে বানানো পাতলা মাছের ঝোল , স্বাস্থকরতো বটেই , সেই সঙ্গে সুস্বাদুও | মাংসের থেকেও এ হোটেলে মাছের পদের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। তবে এই হোটেলের কচি পাঁঠার ঝোলটিও কিন্তু খাসা |চিংড়ি, পাবদা, ইলিশ, ভোলা, ভেটকি, ট্যাংরা ইত্যাদি মাছের পদের ক্ষেত্রে দাম নির্দিষ্ট নয়। বাজারে মাছের দাম যেদিন যেমন তার ওপর নির্ভর করে দৈনন্দিন এসব মাছের পদগুলোর দাম ঠিক করা হয়।  এছাড়া আছে মুরগীর ঝোলও। এবার একটু মেনুর দিকে তাকানো যাক। দুপুরের মেনুতে রয়েছে সরু চালের ভাত, মোটা চালের ভাত, সোনা মুগের ডাল, মসুরের পাতলা ডাল, সঙ্গে ঝুরো আলুভাজা ,  বিভিন্ন শাকের চচ্চড়ি,মুড়িঘন্ট, শুক্ত, আলুপোস্ত, এঁচোড়ের সবজি, ফুলকপির তরকারি, আলুভাতে বা আলুর ভর্তা ইত্যাদি। সঙ্গে রয়েছে দশ-বারো রকমের মাছ আর খাসি ও মুরগির মাংস এবং আম অথবা টমাট্যোর চাটনি। মাছের মধ্যে রুই পোস্ত, রুই কালিয়া, রুই কষা, রুই মাছের পাতলা ঝোল, কাতলার কষা, ভাপা ইলিশ, সরিষা ইলিশ, ট্যাংরা মাছের ঝোল, পাবদার ঝোল, চিতল মাছের পেটি, ভোলা মাছের ঝাল, ভেটকি মাছের পাতুরি, বাগদা চিংড়ি, গলদা চিংড়ি, কই, সিঙ্গি, মাগুর ও মৌরালা মাছের ঝোল ইত্যাদি। আর রাতের বেলা রুটি, ভাত, ভেজিটেবল তড়কা,চিকেন তড়কা, ডিম তড়কা, ডিমের ঝোল আর চিকেন কষা। অবশ্য কেউ চাইলে রাতেও খাসির ঝোল বা পছন্দমতো মাছ খেতে পারেন।

সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমে খাওয়া শুরু হয় প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে। চলে বেলা ৩টে অবধি। আবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাতের খাবারের জন্য মানুষ ভিড় জমান এই হোটেলে। প্রতিদিন অফিস করেন যাঁরা এমন মানুষের জন্য ভাত, ডাল, তরকারি, চারাপোনা আর রুই মাছের পাতলা ঝোল ও চাটনির ব্যবস্থা থাকে। আর যাঁরা মাঝেসাঝে খেতে আসেন তাঁদের এবং পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন মাছ ও মাংসের নানা ধরনের মুখরোচক পদের ব্যবস্থা থাকে। শুধু তাই নয় অসুস্থ মানুষদের কথা মাথায় রেখেও বিশেষ পদের ব্যবস্থা আছে এখানে।আগে গোটা রেস্তোরাঁ ছিল নন-এসি। এখন আলাদা করে এসি কেবিন তৈরি করা হয়েছে। হোটেলে বসে খাওয়ার পাশাপাশি পার্সেল নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ভবিষ্যতে অ্যাপ বেইসড ফুড চেইনের সঙ্গেও এই হোটেলের খাবার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এই হোটেলের। এই হোটেলের দায়িত্বে এখন দেবযানী ও রীতা। দেবযানী পেশায় শিক্ষিকা আর রীতা সরকারি চাকরিজীবী। চাকরি সামলে ননদ বৌদিতে মিলে দিব্যি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এই ঐতিহ্যবাহী হোটেল। দেবযানীর স্বামী সুজিত সেন দক্ষ হাতে ২০১৫ অবধি হোটেল চালিয়েছেন। সুজিত সেনের মৃত্যুর পর হোটেলের মালিকানা আসে বোন রীতা ও স্ত্রী দেবযানীর ওপর। এই হোটেলের কর্মচারীরা সবাই মিলে একটা পরিবারের মত থাকেন | হোটেলের দিনের পর দিন শ্রীবৃদ্ধির কারণ কিন্তু কর্মচারীদের আন্তরিকতা ও অক্লান্ত পরিশ্রম। নামের সঙ্গে ‘আশ্রম’ শব্দটা যুক্ত থাকার কারণেই বোধহয় বাণিজ্যের থেকেও সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে। অতএব আর দেরি নয়, যারা খেতে ভালোবাসেন খাওয়াতে ভালোবাসেন তাঁরা কোনো এক দুপুরে কিম্বা রাতের খাবার খেতে পৌছে যান জানবাজার  ১৯ নম্বর রানী রাসমণি রোডের সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমে। প্রায় একশ বছর ধরে যারা সুস্বাদু  খাবার পরিবেশন করে আসছে।কিভাবে যাবেন ? জানবাজারের চারমাথার মোড়ের থেকে যে রাস্তাটা ফ্রিস্কুল স্ট্রিটের দিকে চলে যাচ্ছে , বাঁ দিকের ফুটপাথ ধরে সেদিকে এগোলেই  রানি রাসমণির বাড়ির ফটক পার করলেই চোখে পড়বে সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমের সাইনবোর্ড লাগানো ছোট্ট গেটটা | অনেক গল্প হল এবার শুধু গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকার অপেক্ষা।

ঠিকানাঃ

হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম১৯, রানী রাসমনী রোডজানবাজার, কোলকাতা – ৭০০ ০৮৭