যার কোনো ব্যাখ্যা নেই

🔴 #যার_কোনো_ব্যাখ্যা_নেই

আলিপুরের জেলখানার উঁচু পাঁচিলটার গাঘেঁষে যে প্রাসাদোপম বাড়িটা আজ ডি .এম বাংলো নামে পরিচিত | এককালে ওতেই থাকতেন চব্বিশ পরগণার ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট স্যার রিচমন্ড থ্যাকার , বিখ্যাত লেখক উইলিয়াম ম্যাকপিস থ্যাকারের বাবা। অত বড় বাড়িটা সারাদিন যেন খাঁ খাঁ করতো | লোক বলতে সস্ত্রীক মিঃ থ্যাকার , তাদের চার বছরের ছেলে আর তার গভর্নেস মিস গ্ল্যাডিংস | একজন আর্দালি আর একজন খানসামা ছিল বটে , তবে তারা রাতে থাকত না | ডিনার পর্ব সমাধা হলে তারা পাশের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে চলে যেত | ছোট্ট উইলিয়াম ঘুমিয়ে পড়লে নিজের ঘুম না আসা পর্যন্ত বই পড়তেন মিস গ্ল্যাডিংস |

আজ বইয়ে কিছুতেই মন বসছে না | পূবের বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে মোহময়ী চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে গ্ল্যাডিংস | গরমকালের সন্ধ্যের পর বেশ ফুরফুরে হাওয়া দেয় | মন্ত্রমুগ্ধের মতো আচ্ছন্ন হয়েছিল সে , হঠাৎ ঘোর কাটলো মেয়েলি গলায় একটা চাপা কান্নার আওয়াজে | আওয়াজটা অনুসরণ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সে | তার মনে হলো পাশের সার্ভেন্ট কোয়াটারে কেউ কাঁদছে হয়তো , দেশ থেকে কোনও চিঠি এসেছে .. কোনও দুঃসংবাদ | এসব সাতপাঁচ ভেবে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতে গিয়ে একটা ঘরের সামনে থমকে দাঁড়ালো গ্ল্যাডিংস | আওয়াজটা এই ঘর থেকেই আসছে | অথচ এঘর তো বরাবর তালা বন্ধই থাকে | পুরোনো অব্যবহৃত জিনিসপত্র স্তূপাকার করে রাখা থাকে বলে শুনেছে সে | ঠিক তখনি তার মনে পড়ে গেলো – আজ প্রথম নয় , দু তিন দিন আগেও একবার এরকম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনেছে সে |

কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে জানলার পুরোনো ঝুল আর ধুলো মাখা কাঠের খড়খড়িটা একটু তুলতেই চমকে গেলো সে | লম্বা গাউন পরা একজন কেউ পেছন ফিরে পিয়ানোটার সামনে বসে আছে | ঘোর কাটতে না কাটতেই পিয়ানোর অপূর্ব সুরমূর্ছনায় বিভোর হয়ে গেলো গ্ল্যাডিংস | অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞাসা করলো. ” কে ? ” অমনি পিয়ানো গেলো থেমে , আর ছায়ামূর্তিও হল অদৃশ্য | প্রচণ্ড ভয়ে পড়ি মরি করে নিজের ঘরে এসে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলো | ডায়রি লেখার অভ্যেস ছিল তার , তাই দেরি না করে তারিখ দিয়ে ঘটনাটা লিখে রাখলো সে |

এর পর বেশ কিছুকাল কেটে গেছে | এক বর্ষণমুখর দিনে আবার ঘটলো সেই ঘটনা | এবারে কান্না যেন আরো মর্মান্তিক , হৃদয়বিদারক |

এর পরের বছর গ্ল্যাডিংস ফিরে যান তার নিজের দেশ ইংল্যান্ডে | বিলেত ফিরে যাওয়ার বারো বছর পরে যখন গ্ল্যাডিংসের স্মৃতি থেকে পিয়ানোর সেই ঘটনা প্রায় ফিকে হয়ে এসেছে এমন সময়ে তিনি জানতে পেরেছিলেন সেই রাত্রির সেই সুরলহরীর বিস্ময়কর ইতিহাস |

সেবার গ্ল্যাডিংস তার এক বাল্যবন্ধুর আমন্ত্রণে ছুটি কাটাতে যান তার বাড়িতে , আয়ারল্যান্ডের এক বর্ধিষ্ণু গ্রামে | দুএকদিন পরেই এক সান্ধ্য চায়ের আসরে তার ভারতে থাকার প্রসঙ্গ উঠলে প্রতিবেশী মিসেস ডোনাল্ডের কাছে জানতে পারেন তাঁরাও ইন্ডিয়াতে ছিলেন এবং কাকতালীয় ভাবে স্বামীর কর্মসূত্রে আলিপুরের ওই বাংলোতেই থাকতেন তাঁরা | এও জানতে পারেন যে ভদ্রমহিলার মা মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে থাকতেন ওই বাংলোয় এবং তিনি খুব ভালো পিয়ানো বাজাতে পারতেন | তাঁর মা মারা যান পয়লা জুলাই ১ লা জুলাই এক বর্ষণমুখর রাতে | তার আগে মার্চ মাসের ১২ তারিখ তাঁর প্রথমবার হার্ট এট্যাক হয় , তখন থেকে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন | পিয়ানোটা বড়ো সাধের জিনিস ছিল তাঁর | জাহাজে অত জিনিস আনার অসুবিধের কারণে বেশ কিছু আসবাবের সঙ্গে পিয়ানোটাও ফেলে আসেন কলকাতার বাড়িতে | অর্থাৎ প্রথমবার যখন গ্ল্যাডিংস ওই বৃদ্ধা ভদ্রমহিলাকে দেখেছিলেন , তখন উনি বেঁচে , ‘ভূত দেখেছেন’ এমনটা বলা যাবে না |

মৃত্যুর পর স্থূলদেহ ধ্বংস হলেও কিছু আনস্যাটিসফায়েড ডিজায়ার, অর্থাৎ অতৃপ্ত বাসনা কাটিয়ে ওঠা যায় না |
সুক্ষ আত্মা তাই সদ্য ফেলে আসা জীবনের মায়া কাটাতে পারে না সহজে |
জীবিত অবস্থাতে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত আটাচমেন্ট মৃত্যুর পর আত্মাকে সহজে উর্দ্ধগামী হতে দেয় না |

অনেক সময় ‘Travelling Clairvoyance’ এর মাধ্যমে জীবিত অবস্থাতেও সুক্ষ আত্মা তার দেহপিঞ্জরের বাইরে বেরিয়ে বহুদূরে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে | তবে এক্ষমতা সাধারণত উচ্চকোটির সাধকেরা যোগাভ্যাসের মাধ্যমে অর্জন করে থাকেন |

দীপঙ্কর দাশগুপ্তদার  ( https://dipankardasguptablog.wordpress.com/ ) কাছ থেকে শুনেছি যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ীর এই travelling clairvoyance বিদ্যা জানা ছিল। খড়গপুরে সে সময় রেলের এক সাহেবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়। সাহেবের খুব দুশ্চিন্তা। তাঁর সন্তান-সম্ভবা স্ত্রী লন্ডনে এবং খুব অসুস্থ। অনেকদিন হল কিছুতেই খবর পাচ্ছেন না। তখন শ্যামাচরণ লাহিড়ী সূক্ষ্ম শরীরে মেমসাহেবকে গিয়ে দেখে আসেন এবং সাহেবকে আশ্বস্ত করেন। শ্যামাচরণ লাহিড়ী সাহেবকে স্ত্রীর চেহারার হুবহু বর্ণনা দেন। বিলেতে তাঁর বাড়ি ঘর, চারপাশের পরিবেশ, স্ত্রীর পছন্দ-অপছন্দ সব কিছুর নিখুঁত বর্ণনা দেন। শুধু তাই নয়, তিনি সাহেবকে আশ্বস্ত করেন, ” তুমি স্ত্রীর চিঠি শীঘ্রই পাবে। আর অচিরে তোমার জন্যে সুসংবাদ অপেক্ষা করছে। তোমার একটি সুন্দর, ফুটফুটে পুত্র সন্তান হবে।”
সত্যিই কয়েকদিনের মধ্যে সাহেব স্ত্রীর পত্র পেলেন। সাহেবের স্ত্রী পরে ওনাকে জানিয়েছিলেন , ভারতীয় পোষাক পরা ( ধুতি , ফতুয়া ) একজন সৌম্য দর্শন ভদ্রলোক এসেছিলেন তার খবর নিতে , মেমসাহেবকে তিনি বলেছিলেন যে সাহেবই নাকি ওনাকে পাঠিয়েছেন ।
তবে কখনও কখনও খুব সাধারণ মানুষেরও রোগগ্রস্থ অবস্থায় বা মৃত্যুশয্যায় বা ব্যাখ্যাতীত কোনও কারণে ‘telesthesia’ বা দৈবদৃষ্টি বা ‘ আকাশদৃষ্টি ‘ পেয়ে থাকেন যার ফলে তারা সুক্ষ দেহে তাদের প্রিয়তম কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি দুর্বার আকর্ষণে অতি দূর দেশেও পৌঁছে যেতে পারে | এক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছিল |

তথ্যঋণ –  Ghost Stories of Old Calcutta- A F M Abdul Ali

বারিদবরণ ঘোষ , শ্রীদীপঙ্কর দাশগুপ্ত  এবং অভিজিৎ দাস

61A81101-D631-4082-BE58-DCBBC1A39133

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.