রান্না

অথ বারাণসী কথা – মণিকর্ণিকার ঘাট

3D6BE8E9-A93C-4826-83FA-F2F8976131AB
গঙ্গাবক্ষ থেকে মণিকর্ণিকা ঘাট

বেনারসের গলির গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ নাকে এলো তীব্র মরা পোড়ানোর গন্ধ , তাকিয়ে দেখলাম দোকানের সাইনবোর্ডে হিন্দিতে লেখা “কাচোরি গালি ” | গলিতে সর্বসাকুল্যে দুটো চাট-পকোড়ার দোকান আর একটা পুরি- সবজির দোকান ছাড়া খাবার দোকান বড় একটা নজরে পড়ে না , অথচ নাম কচুরি গলি 🧐
কচুরির দোকান খুঁজতে গিয়ে নজরে পড়ল তারই তুতোভাই সিঙ্গাড়ার দিকে | একটা পকোড়ার দোকানে বানারসী ‘সমোসা’ খেতে গিয়ে পড়লাম সমস্যায়| শালপাতার বাটিতে সিঙ্গাড়াটা রেখে হাতে করে ভেঙে তার ওপরে খানিকটা প্রায় মশলাবিহীন গোটা মুগডাল সেদ্ধ আর ইমলি-পুদিনার ‘হারি চাটনি’ মিশিয়ে সুক্ষ করে কাটা মুলোর কুচি দিয়ে গার্নিশ করে বাটিটা  আমার হাতে ধরিয়ে দিল দোকানদার | চিনাবাদাম সহযোগে ফুলকপি আলু দিয়ে বানানো বাঙালি সিঙ্গাড়ার সঙ্গে এই ঘ্যাঁটটির বিস্তর ফারাক | দ্বিধাগ্রস্থ মনে বাটিটাকে আপন করছি এমন সময় দোকানদার আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলে উঠলেন – “আপ একবার খা কে তো দেখিয়ে বেনারসী ইস্ট্যাইলমে , আপকে কালকত্তেমে জো বড়াবাজার হ্যায় না , ওহা  হামারে দুকান সে পেঁড়ে ওর লাড্ডু বহত যাতে হ্যায় ” | বোঝো কাণ্ড !! আমার মুখে কি লেখা আছে যে আমি কলকাতার বাঙালি ? আমি তো গীতা দে বা সাবিত্রী দেবীর স্টাইলে হিন্দি বলিনা , তাহলে বুঝলো কি করে ! যাকগে ঘ্যাঁটটি উদরস্ত করতে করতে অনুসন্ধিৎসু বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম কচুরি গলির নামের ব্যাপারটা |
দোকানদার বললেন বেনারসের অলিতে গলিতে কচুরি বা পুরি জিলিপি চাট পকোড়ার দোকান প্রচুর | তবে এই কচুরি গলির বিশেষত্ব হলো কয়েক মিনিট পরপরই এখানে ‘রাম নাম সত্য হ্যায় ‘ ধ্বনি শোনা যায় | হিন্দু শাস্ত্রে আছে –
“अयोध्या-मथुरामायाकाशीकांचीत्वन्तिका पुरी द्वारावतीचैव सप्तैते मोक्षदायिकाः।”

অর্থাৎ অযোধ্যা, মথুরা, মায়া , কাশী বা বারাণসী, কাঞ্চী বা কাঞ্চিপুরম , অবন্তিকা ( উজ্জয়িনী ) পুরী , দ্বারাবতী বা দ্বারকা এই সাতটি স্হানকে মোক্ষদায়িনী সপ্তপুরী বলা হয় | মৃত্যুর পর এর মধ্যে যেকোন একটিতে অন্তিমসংস্কার করা হলে মানুষ মোক্ষ লাভ করে , অর্থাৎ জন্মান্তরের আবর্ত থেকে মুক্ত হয় | সেই কারণে , মোক্ষ লাভের উদ্যেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটে আসেন শিবঠাকুরের আপন দেশে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে | এউদ্দেশ্যে হরিরাম গোয়েঙ্কা ১৯০৮ সালে একটি অন্তর্জলি গৃহের ভিত্তিপ্রস্তর স্হাপন করেন , পরবর্তীকালে এটি ডালমিয়া ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত হয়| ১৯৫০ সাল থেকে এই ১২ কামরাবিশিষ্ট আশ্রমটি জনসাধারণের উদ্দেশ্যে খুলে দেওয়া হয় , নাম হয় – মুক্তি-ভবন | মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ প্রায় নিখরচায় এখানে থাকতে পারেন | তবে দুসপ্তাহের মধ্যে পৃথিবী না ছাড়লে মুক্তিভবনের ঘর ছেড়ে দিতে হয় |
এপ্রসঙ্গে মনেপড়ে গেল কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশানে পাশে মৃত্যুপথযাত্রীদের জন্য এমনই একটি অন্তর্জলী গৃহ বানিয়ে দিয়েছিলেন রাণী রাসমণির স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাস | আবার ফিরে আসি কলকাতা থেকে কাশীর কচুরি গলিতে , যে গলি সোজা গিয়ে মিশেছে মণিকর্ণিকার ঘাটে |

সিঙ্গাড়া পর্ব সমাধা করে ওই গলিটা দিয়েই ঘাটের দিকে হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছি , এমন সময় ডান দিকে একটা ছোট দোকান নজরে পড়ল | গলির থেকে দু-তিন ধাপ সিঁড়ি উপরে উঠে সরু লম্বাটে একটা প্রায়ান্ধকার দোকান | দোকানে আসবাব বলতে কয়েকটা লম্বা সরু কাঠের তক্তা লাগানো বেঞ্চ, অনেকটা স্কুলের বেঞ্চের মতো | তাতে প্রচুর বিদেশী পর্যটক বসে আছেন মাটির ভাঁড় হাতে |
দেওয়ালে অসংখ্য চিরকুট সাঁটা , মনে হল দোকানে যাঁরা আসেন তাঁরা তাঁদের ভালোলাগার কথা ওভাবে লিখে রেখে যান | পরে জেনেছিলাম ওই দোকানটা কাশীর বিখ্যাত ‘ব্লু লাস্যি শপ’ | নয় নয় করে প্রায় ৭৫ রকমের লস্যি পাওয়া যায় বেনারসের কচুরি গলির এই এক চিলতে দোকানে।বেনারসের বিখ্যাত ‘মালাই মার কে’ কেশর লাস্যি তো আছেই সঙ্গে আছে ব্যানানা লস্যি, আপেল লস্যি, চকলেট লাস্যি আরও অনেক কিছু | প্রায় ৭৫ বছরের পুরনো এই দোকানের নাম আগে ছিল ‘পান্নালাল লস্যি ওয়ালা’। শোনা যায় ২০০৪-এ নীল রঙে রাঙানো এই দোকানের নাম বদলে ‘ ব্লু লস্যি শপ ‘ রাখা হয় | সত্যজিৎ রায়ের একটা সিনেমায় এই দোকানের মালিককে একঝলক দেখা গিয়েছিল | মনে পড়ে , জয় বাবা ফেলুনাথের সেই দৃশ্যটা , যেখানে ফেলুদা , তোপসে আর লালমোহন বাবু কাশীর সরু গলি দিয়ে চলেছেন মগনলাল মেঘরাজের আস্তানায় ? ওই দৃশ্যে যে লোকটি তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল , তিনিই এই ব্লু লাস্যি শপের প্রতিষ্ঠাতা |
এই লস্যির দোকান ছাড়িয়ে আরো দু-তিন মিনিট হাঁটলেই মণিকর্ণিকার ঘাট |

এই মণিকর্ণিকা সম্মন্ধে কাশীখণ্ডে লেখা আছে কাশীতে যখন গঙ্গার অবতরণ হয়নি, তখন নারায়ণ এই কাশীতীর্থে এসে তার সুদর্শনচক্র দিয়ে এখানে একটি কূপ বা কুণ্ড খনন করে তার পাশেই কঠোর তপস্যা শুরু করেন।
ক্রমে তপস্যার তেজে তার দেহের ঘামে কুণ্ডটি পূর্ণ হয়ে যায় এবং এই কুণ্ডের নাম হয় চক্র পুষ্করিণী। সেই সময় বিশ্বনাথ ও অন্নপূর্ণা তাদের আনন্দনিকেতন বারাণসী বা কাশী পরিভ্রমণে বেরিয়ে এই জায়গায় এসে পৌঁছান এবং ধ্যানমগ্ন তেজোদ্বীপ্ত নারায়ণকে দেখতে গিয়ে অসাবধানতা বশতঃ বিশ্বনাথের কর্ণকুন্ডলের মণি ওই চক্রপুস্করিণীতে পড়ে যায় আর সেই থেকেই এই জায়গার নাম হয় ‘মণিকর্ণিকা’ | মণিকর্ণিকার ঘাটের কাছে আজও সেই চক্রপুস্করিণী কুণ্ড দেখতে পাওয়া যায় | গঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় বেনারসের গঙ্গার জলস্তর নেমে গেলে এই কুণ্ডের জলও শুকিয়ে যায় |

শোনা যায় ভগবান শঙ্করের কানের কুণ্ডল কুড়িয়ে পায় এক ডোম | সে প্রথমে তা দিতে অস্মীকার করলে শিব কুপিত হয়ে তাকে শাপ দেন , পরে তার আকুল ক্ষমা প্রার্থনায় দয়া পরবশ হয়ে তাকে আশীর্বাদ করেন যে তার এবং তার বংশজদের হাতে যাদের দাহ-সংস্কার হবে তারা জন্মান্তরের আবর্ত থেকে মুক্ত হবে , স্বর্গলাভ হবে |

কথিত আছে, ঋষি বিশ্বামিত্রের শাপে সর্বস্ব খুইয়ে রাজা হরিশচন্দ্র যখন বারাণসীতে আসেন, তখন বর্তমান ডোম রাজা জগদীশের পূর্বপুরুষ কালু ডোমের অধীনেই দেহ সৎকারের কাজ করতেন তিনি।
এই মণিকর্ণিকার ঘাটে রয়েছে কয়েকটি মন্দির। তার মধ্যে প্রধান হল তারকেশ্বরের মন্দির। প্রচলিত বিশ্বাস হল, কাশীবাসীর অন্তিম শয্যায় অর্থাৎ চিতায় অগ্নিসংযোগের মুহূর্তে কালো কাপড় পরা ডোমের বেশে তাদের কানে তারকব্রহ্ম মন্ত্র দেন এই তারকেশ্বর শিব|
মোক্ষদায়িনী সপ্তপুরীর এক পুরী এই কাশীর স্বর্গের দ্বার মণিকর্ণিকার ঘাটে জ্বলতে থাকার চিতার আগুনের দিকে তাকিয়ে জীবনের সব হিসেব নিকেশ এক লহমায় গুলিয়ে যায় | মনে হয় শিব স্বয়ং এসে আমায় মোক্ষ প্রদান করবেন কিনা জানিনা তবে ‘খালি হাতে এসেছি আর খালি হাতেই চলে যেতে হবে’ এই সার সত্য উপলব্ধি করতে না পারলে জাগতিক বস্তুর মায়া কাটানো সম্ভব নয় এবং পুনর্জন্মের আবর্ত থেকে মুক্তি লাভও সম্ভব নয় |

D5D234A2-2244-4113-9B5B-1E28A5492E3F
মণিকর্ণিকা ঘাটে জ্বলতে থাকা সারিসারি চিতা

মণিকর্ণিকার ঘাটে এক অর্ধনিমজ্জিত অদ্ভুতদর্শন মন্দির চোখে পড়ে | অপূর্ব কারুকার্য করা এই মন্দিরটি সম্পর্কে প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী এক দাম্ভিক রাজা মাতৃঋণ শোধ করার মানসে এই মন্দির তৈরী করেন , তার মা জানতে পেরে মন্দিরে অধিষ্ঠিত মহাদেবের বিগ্রহের সামনে মাথা ঠুকে প্রাণত্যাগ করেন | এর পরেই শিব ওই রাজার ওপর রেগে যান এবং মন্দিরটিও হেলে গিয়ে গঙ্গায় অর্ধেক ডুবে যায় , সেই থেকে ওই অবস্থাতেই আছে | সত্যিই তো মাতৃঋণ শোধ করা কি অত সহজ ! তা সে কনকাঞ্জলি দিয়েই হোক বা মন্দির তৈরী করে |

0CC0A7DB-6F84-4A9B-8960-AC2B6D5AF026
ছবির ডানদিকে গঙ্গার জলে অর্ধনিমজ্জিত সেই হেলানো মন্দির