গঙ্গাজল বা পদ্মচিনি ও গঙ্গাজলি নাড়ু -বাংলার একটি হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি

আমোদিনী দাশগুপ্ত …
চেনেন ? চেনেন না তো ? ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বালিকাবধূ ,যে মাত্র ১২ বছর বয়সে তার পুতুলের সংসার ছেড়ে নিজের সংসারের সর্বময় কর্ত্রী হয়ে দক্ষতার সঙ্গে সংসারধর্ম পালন করেতে শুরু করেছিলেন এবং অভাবের সংসারেও পরম যত্নের সঙ্গে নয়টি সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করেছিলেন। তার আরো একটা শখ ছিল , দুপুরে সংসারের সবার রান্নাখাওয়ার পাট মিটলে মাটির উনুনের নিভু আঁচে রকমারি মিষ্টি ও মুখরোচক খাবার বানানো।
একটা সময় ছিল, যখন বাংলার ঘরে ঘরে এমন আমোদিনীদের দেখা পাওয়া যেত। বাংলা তখনও ‘এপার’ আর ‘ওপার’ এই দুভাগে ভাগ হয়নি। লেখাটা পড়তে পড়তে আপনারও হয়তো আপনাদের বাড়ির আমোদিনীর কথা মনে পড়বে… মানে আপনাদের ঠাকুমা বা দিদিমার কথা।
পুরোনো কলকাতার গল্প গ্রুপে একবার দীপঙ্কর দাশগুপ্ত দার “বাবুমা’র” ( ঠাকুমা ) বানানো ভাজা বরফির গল্প শুনতে শুনতে তখনকার দিনে বিজয়াদশমী আর কোজাগরী লক্ষীপুজোয় বানানো চিঁড়া জিরা ও গঙ্গাজলির কথা প্রথম জানতে পারি। হারিয়ে যাওয়া এই মিষ্টি দুটোকে খুঁজতে শুরু করি পুরোনো দিনের রান্নার বই আর বাংলাসাহিত্যের আনাচে কানাচে। চিঁড়া জিরাকে খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়নি কিন্তু গঙ্গাজল…. নাহ্ তার আর দেখা মেলে না। অবশেষে পাওয়া গেল তাকে, আমোদিনীর হেঁশেলে। আর যার স্মৃতিচারণের জন্য এটা সম্ভব হল, সে আমার দেবী মাসি – দেবলীনা সেন। আমোদিনী তাঁর আদরের ‘দিদিমণি’ ( দিদা )।

PSX_20180724_170933

🔴 গঙ্গাজল বলুন বা গঙ্গাজলি , এই হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি বানাতে উপকরণ লাগে যৎসামান্য।

✔️ নারকেল বাটা বা কোড়া – ১ কাপ

✔️ চিনি – ১ কাপ

✔️ জল – ১/২ কাপ

✔️ ছোট এলাচ – ৪ টে

✔️ কর্পূর – এক চিমটি

✔️ আর লাগবে এক গামলা ধৈর্য্য

নারকেল বাটা

🔴 পদ্ধতি অত্যন্ত সহজ –

নারকেলটা প্রথমে জলে বেশকিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখতে হবে যাতে কোড়ানোর সময় তার দু’এক গাছা খয়েরী রঙের দাঁড়িগোঁফ ধবধবে সাদা নারকেল কোড়ার সঙ্গে না মিশে যায়।

এরপর নারকেলের সাদা অংশটা ছাড়িয়ে বেটে নিতে হবে। অনেকে গরমজলে ধুয়ে তেলটা বেরকরে নেন। আমি করিনি।

এবার খুব কম আঁচে চিনি ও জল দিয়ে তাতে এলাচ গুলো আধ থেঁতো করে দিতে হবে যাতে দানাগুলো বেরিয়ে না আসে।

এবার চিনির রস গাঢ় হলে এলাচ গুলো তুলে ফেলে তাতে নারকেল বাটা দিয়ে নেড়ে ছেড়ে নারকেলের সঙ্গে রস একেবারে মিশিয়ে দিতে হবে।

লক্ষ্য রাখতে হবে যেন রস ক্যারামেলাইস না হয়ে যায় বা নারকেল লাল না হয়।

এবার একচিমটে কর্পূর মিশিয়ে একটা বড় ট্রে বা থালায় ঢেলে শুকোনোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

PSX_20180724_171846.jpg

শুকিয়ে গেলে তাকে আর একবার শীলে বা মিক্সিতে বেটে গুঁড়ো পাউডারের মতো তৈরী করতে হবে। অনেকে এইভাবেই রাখেন গঙ্গাজল বা গঙ্গাজলীকে। অনেকে আবার এটা দিয়ে ছাঁচ বানান। সেক্ষেত্রে একটা মাড় ছাড়া সুতি বা মলমলের কাপড় একটা বাটির মধ্যে পেতে দিয়ে তার ওপর গঙ্গাজলী গুঁড়োটা খুব চেপেচেপে ভরতে হবে যাতে বাটির আকার ধারণ করে। এবার সাবধানে কাপড়টা টানলেই গঙ্গাজল বা গঙ্গাজল মিষ্টির ছাঁচটা বেড়িয়ে আসবে।

অনেকে আবার ছাঁচে ফেলে সন্দেশ এর মত বানান। আমার কাছে ছাঁচ নেই  ফেসবুকে  সুদীপ্তা ভট্যাচার্য্য পাল নামে একজন ভদ্রমহিলা আমাকে এই গঙ্গাজলি ছাঁচের ছবি পাঠিয়েছেন। তাঁর অনুমতি নিয়েই আমি এখানে সেই ছবি দিলাম –

PSX_20180802_161641

PSX_20180724_171418

অনেকে আবার এটা দিয়ে নাড়ুও বানান – গঙ্গাজলি নাড়ু। শ্রীশ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী লিখিত চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে এই গঙ্গাজলী নাড়ুর উল্লেখ পাওয়া যায়। রথযাত্রার সময় মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের সঙ্গে মিলিত হবার উদ্দেশ্যে শ্রীক্ষেত্রে যেতেন।তখনকার দিনেতো এত গাড়িঘোড়া ছিল না। তাই প্রায় একমাস আগে যাত্রা করতেন। যাওয়ার আগে পানিহাটিতে ভাগবতাচার্য্য রাঘব পন্ডিতের বাড়িতে সেবা গ্রহণ করতেন। রাঘবপন্ডিতের নির্দেশে তার বাল্যবিধবা ভগিনী দময়ন্তী মহাপ্রভুর জন্য যাত্রাপথের রসদ হিসাবে নানান ব্যঞ্জন , শুকনো মিষ্টি, আচার প্রভৃতি বানিয়ে ঝোলায় ভরে দিতেন। শ্রীচৈতন্যদেবের প্রিয় এই সব উপাদেয় খাবারের মধ্যে অন্যতম হল গঙ্গাজলি নাড়ু।

1532500958771

” আম্রকাসুন্দী, ঝাল-কাসুন্দি, আদা কাসুন্দি আর।
নেবু আদা আম্র কলি বিবিধ প্রকার।।

আমসি আম্রখণ্ড আর তৈলাম্র আমতা।
চূর্ণ করি দিয়াছেন পুরাণ শুকুতা।।

শুকুতা বলি’ অবজ্ঞা না করিহ চিতে।
শুকুতায় যে প্রীতি প্রভুর নহে পঞ্চামৃতে।।

ধনিয়া, মহুরী তণ্ডুল চূর্ণ করিয়া।
লাড়ু বাঁধ দিয়াছেন চিনি পাক দিয়া।।

শুঁটিখণ্ড নাড়ু হয় আমপিত্ত হর।
পৃথক পৃথক বাঁধা আছে কুথলি ভিতর।।

কোলি-শুঁটি, কোলি-চূর্ণ কোলিখণ্ড আর।
কত নাম লব যত প্রকার আচার।।

নারিকেল-খণ্ড আর নাড়ু গঙ্গাজল।
চিরস্থায়ী খণ্ড বিকার দিয়েছে সকল।।

শালিকা চুটি ধান্যের আতপ চিঁড়া করি।
দিয়াছেন বড় বড় কুথলিতে ভরি।।

কতক চিঁড়া হুড়ুম করি ঘৃতেতে ভাজিয়া।
চিনি পাকে লাড়ু কৈল কর্পূরাদি দিয়া।।

শালি-তণ্ডুল-ভাজা চূর্ণ করিয়া।
ঘৃতসিক্তে নাড়ু কৈল চিনি পাক দিয়া।।

কর্পূর মরিচ এলাচ লবঙ্গ রসবাস।
চূর্ণ করি নাড়ু কৈল পরম সুবাস।। ”

আজও পানিহাটিতে চিঁড়াদধি দণ্ড মহোৎসবের দিনে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ভক্তরা মহাপ্রভুর জন্য “রাঘবের ঝালি” প্রস্তুত করেন যাতে থাকে এই গঙ্গাজল নাড়ু।

1532473229349

চৈতন্যচরিতামৃতে গঙ্গাজল নাড়ুকে যিনি খুঁজে দিয়েছেন তিনি হলেন আমার মাস্টারমশাই শ্রী অমিতাভ পুরকায়স্থ।

PSX_20180724_191141
ও হ্যাঁ , দেবী মাসির দিদিমণির আরও গল্প শুনতে চাইলে পড়তে হবে “আমোদিনীর হেঁশেল”

ইনিই হলেন আমোদিনী দাশগুপ্ত
ইনিই হলেন আমোদিনী দাশগুপ্ত

https://bangalnama.wordpress.com/2009/07/06/amodinir-hneshel/

Advertisements

2 thoughts on “গঙ্গাজল বা পদ্মচিনি ও গঙ্গাজলি নাড়ু -বাংলার একটি হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.