গল্প

শ্যমরূপা গড় ও ইছাই ঘোষের দেউল

রাঢ়বঙ্গ তথা রাঢ়ভূম বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বর্ধমানের কাঁকসা থানার অধীনে গভীর জঙ্গলে ঘেরা গৌরাঙ্গপুর গ্রাম। অতীতের নাম ত্রিষষ্ঠী গড়। ওই অঞ্চলে আগে লোহার কারিগর ‘ঢেকারু’ সম্প্রদায়ের লোকজন বাস করতেন। তাদের নামেই এলাকার নাম হয়ে যায় ‘ঢেকুর’ গড়। এখনো বর্ধমানের ওই অঞ্চলে কয়েক ঘর ঢেকারু সম্প্রদায়ের মানুষজনের দেখা মেলে। জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে অজয় নদ। ওপারে কবি জয়দেবের কেন্দুলি, আর এপারে শাল-অর্জুন-শিরীষ এবং বুনো গাছগাছালিতে ভরা গা ছমছমে জঙ্গল। এমনই জঙ্গলের মাঝে রয়েছে রাঢ় বঙ্গের লুপ্তপ্রায় গৌরবোজ্বল ইতিহাসের সাক্ষীস্বরূপ এক বিশাল রেখ দেউল, যা ‘ইছাই ঘোষের দেউল’ নামে প্রসিদ্ধ। শ’খানেক ফুট উঁচু মন্দিরের গায়ে জীর্ণ টেরাকোটার নকশা আজও বহন করে চলেছে অতীতের স্মৃতি। এই দেউল এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে রক্ষিত।

ধর্মমঙ্গল কাব্য থেকে জানা যায় ঢেকুর গড়ের অধিপতি চণ্ডীর বরপুত্র অসীম শক্তিশালী সামন্তরাজ ইছাই ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষ প্রচণ্ডভাবে বিদ্রোহী স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে গৌড়েশ্বরের নির্দেশে তাঁকে দমন করতে গিয়ে গৌড়েশ্বরের অধীনস্ত মেদিনীপুরের কোনো এক অঞ্চলের আরেক সামন্তরাজা কর্ণ সেন পরাজিত হন।
জয়ের নিদর্শন স্বরূপ ইছাই ঘোষ তার আরাধ্য শিবের উদ্দেশ্যে তৈরী করেন টেরাকোটার কারুকাজ যুক্ত অপূর্ব এক রেখ দেউল, যা ইছাই ঘোষের দেউল নামে রাঢ়বঙ্গের ইতিহাসে খ্যাত।
এর কিছুকাল পরে, ছয় পুত্র ও পুত্রবধূ এবং ডোম জাতি সম্ভূত সেনাপতি কালুবীরের প্রাণহানী ও প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির শোকে কাতর বৃদ্ধ কর্ণসেনের সঙ্গে গৌড়েশ্বর নিজের শ্যালিকা রঞ্জাবতীর বিয়ে দেন। ধর্মমঙ্গল কাব্য থেকে জানাযায় বৃদ্ধ অপৌত্রক সামন্তরাজা কর্নসেনের সুন্দরী পত্নী রঞ্জাবতী পুত্রলাভের আশায় ধর্মঠাকুরের পুজা, কঠোর ব্রত ও কৃচ্ছ্সাধনের পর তাঁর কৃপায় পুত্রসন্তান লাভ করেন। পুত্রের নাম রাখা হয় লাউ সেন। পরবর্তীকালে এই লাউসেনের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন ‘ইছাই গোয়ালা’ বা ঈশ্বর ঘোষ। বর্ধমানের লালমাটিতে ছড়িয়ে আছে তাঁদের বীরগাথা।

ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষের লেখা থেকে জানা যায় রাঢ়বঙ্গের তৎকালীন অধীশ্বর মহিপালের অধীনস্ত সামন্তরাজা ইছাই ঘোষ ছিল বর্ধমানের ঢেক্কুর গড় বা ঢেকুর গড়ের একচ্ছত্র আধিপতি। পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুর জেলার রামগঞ্জ গ্রামে ঈশ্বর ঘোষের একটি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রত্বতাত্ত্বিক ননীগোপাল মজুমদারের মতে এটি পাল যুগের ইতিহাসের সাক্ষ। এই তাম্রশাসন থেকে জানা যায় ইছাই ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষ ছিলেন ধবল ঘোষের পুত্র, বাল ঘোষের পৌত্র, ও ধূর্ত ঘোষের প্রপৌত্র। ধৰ্মমঙ্গল কাব্যানুসারে ইছাইয়ের পিতার নাম সোম ঘোষ।
ঢেকুর সম্প্রদায়ের লোকজন ছিলেন শিব এবং ধৰ্মঠাকুরের উপাসক। ঢেকুর গড়ের অধিপতি শিব ও শক্তির উপাসক ইছাই ঘোষ অজয় নদের দক্ষিণ তীরে ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন এই রেখ দেউলটি। আর পার্শ্ববর্তী বিষ্ণুপুর ও থেরওয়ারীর গ্রামের মধ্যবর্তী জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে নির্মাণ করেছিলেন দুর্গা মন্দির, যা পরবর্তী কালে ‘শ্যমরূপা দুর্গা’ নামে পরিচিতি লাভকরে এবং ঐ এলাকার নাম হয়ে যায় ‘শ্যমরূপা গড়’। রহস্যময় এই মন্দিরকে ঘিরেও রয়েছে অনেক লোকগাথা। এই শ্যামরূপার গড়ের পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ইছাই ঘোষের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আজও আছে। এই গড় জঙ্গলের কোনো অজ্ঞাত উৎস থেকে আজও শোনা যায় কামানের আওয়াজ আর তখনই শুরু হয় শ্যামারূপার মন্দিরের অষ্টমীর সন্ধি পুজো।

মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত প্রস্তরনির্মিত সুদর্শনা দুর্গামুর্তি। উচ্চতায় প্রায় দশ বার ইঞ্চি। মন্দিরপ্রাঙ্গণে রয়েছে একটি হাড়িকাঠ। লোকমুখে শোনা যায়, আগে এখানে কাপালিকেরা নরবলি দিতেন। একবার অজয়নদের ওপারে অবস্থিত কেন্দুলি গ্রাম থেকে ‘গীতগোবিন্দের’ রচয়িতা বৈষ্ণব কবি জয়দেব আসেন এই মন্দির দর্শনে।
তিনি কাপালিককে প্রস্তাব দেন যদি তিনি তাঁকে চাক্ষুষ মাতৃদর্শন করাতে পারেন তবেই প্রমাণ হবে যে কাপালিকের উৎসর্গীকৃত নরবলি দেবী গ্রহণ করেন। যদি কাপালিক তা না পারেন তা’হলে কবি জয়দেব তাঁকে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্যাম রূপ দর্শন করাবেন। তবে তাতে শর্ত আছে একটা, নরবলি বন্ধ করতে হবে। ভক্ত কবি জয়দেবের এই প্রস্তাবে রাজি হলেন কাপালিক। চেষ্টা করলেন তাঁর উপাস্যদেবীকে দর্শন করাতে। ব্যর্থ হলেন। এরপর জয়দেবের ভক্তিপূর্ণ আকুল প্রার্থনায় শ্যামামা শ্যাম রূপ ধারণ করে দর্শন দিলেন কাপালিককে। আনন্দে আবেগে কাপালিক লুটিয়ে পড়লেন প্রেমিক সাধক জয়দেবের চরণতলে। সেই থেকেই মন্দিরে পূজিত দেবীর নাম হল ‘শ্যামরূপা’ দুর্গা আর বন্ধ হল নরবলি।
স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস, লাউ সেনের সঙ্গে যে যুদ্ধে ইছাই ঘোষ পরাজিত ও নিহত হন তার আগে দেবী শ্যমরূপা ইছাই ঘোষকে স্বপ্নাদেশ দেন যে, সপ্তমীতে যুদ্ধে না গিয়ে অষ্টমীতে যেতে কিন্তু দেবীর কথা অমান্য করে তিনি সপ্তমীতেই যুদ্ধে যান এবং পরাজিত হয়ে প্রাণহারান। ইছাই ঘোষ নিহত হলে তার লাউসেনের অনুচরেরা দেবী মূর্তিকে গড় জঙ্গলের ধারে অজয় নদে বিসর্জন দেয়। পরে সেখানে একটি অষ্টধাতুর মূর্তি স্থাপন করা হলে ইছাই ঘোষের পালিত কন্যা কল্যাণী নিজের শ্বশুরবাড়ী যাবার সময় সাথে করে ওই অষ্টধাতুর মূর্তি নিয়ে যান। আসানসোলের বরাকরের কাছে হঠাৎই সেই মূর্তি তাঁর হাত থেকে পরে যায়। ‘দেবী মূর্তি সেই স্থানেই থাকতে চাইছেন’ – এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি ওখানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বরাকরের সেই দেবীই আজ কল্যানেশ্বরী নামে পরিচিত। তবে গড় জঙ্গলের নবনির্মিত মন্দিরে পরে একটি প্রস্তরমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় , যা আজও পূজো হয়।

অজয়ের উত্তর তীরে ‘লাউসেনতলা’ নামে এক গ্রাম আছে। স্থানীয় প্রবাদ অনুসারে লাউসেন এই গ্রামেই তাঁর সৈন্য শিবির স্থাপন করেছিলেন। এখনো ডোম সম্প্রদায়ের বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে প্রতি বছর ১৩ই বৈশাখ তারিখে এই অঞ্চলে আসেন তাঁদের স্বজাতি কালুবীরের পুজো করতে। অজয়ের দক্ষিণ তীরস্থ যে অঞ্চলে ইছাই ঘোষ তথা ঈশ্বর ঘোষের সঙ্গে লাউসেনের যুদ্ধ হয়েছিল সেই জায়গার বর্তমান নাম ‘কাঁদুনে ডাঙা’। স্থানীয় লোকেরা আজও বিভিন্ন পালাপার্বন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রচলিত একটি লোকগীতি গাইতে শোনা যায় –

“শনিবার সপ্তমী সামনে বারবেলা।
আজি রণে যাইওনা ইছাই গোয়ালা”।।

ইছাই ঘোষের দেউল

Photo courtesy : Indrajit Das aka BongBlogger

যে গ্রন্থ গুলি থেকে তথ্য সংগৃহিত হয়েছে সেগুলি হল  –