গল্প

চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী দুর্গা

আমার জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা সবটাই কলকাতায়।  তাও আজও এই শহরটাকে মাঝে মাঝে বড্ডো অচেনা মনে হয়। মনে হয় এখনো অনেক কিছু দেখা বাকি অনেক জানা বাকি।  তাই তাকে নতুন করে জানা আর নতুন করে চেনার তাগিদে বেরিয়ে পড়ি সময়পেলে। আর যতবার তাকে নতুন করে দেখি ততবার নতুনকরে তার প্রেমে পড়ি।
এবারে পুজোর ছুটিতে বেশ লম্বা ছুটি নিয়ে এসেছিলাম কলকাতায়, প্রথম দিকে সময় সুযোগ না হলেও শেষের কয়েকটা দিন পায়ের তলায় সরষে লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি শহরের ওলিগলিতে।  তার মধ্যে থেকেই একটা দিনের অভিজ্ঞতা লিখতে বসেছি আজ।
দুর্গাপুজো কালীপুজো মিটে গেছে , উৎসবের রেশ ধীরে ধীরে কমে এসেছে , শীত তখন জাঁকিয়ে পড়েনি কলকাতায়। কদিন ধরেই উত্তরকোলকাতার ওলিগলি বড্ডো টানছিলো আমায়।  এমনি এক মনখারাপ করা বিকেলে গঙ্গার জলে পা ডুবিয়ে সূর্যাস্ত দেখবো বলে গেছিলাম বাগবাজার গঙ্গার ঘাটে।  ফিরতিপথে মনে হলো চিত্তেশ্বরী মন্দিরটা একবার ঘুরে আসবো।
1520400705256
 এখনকার কাশীপুর এলাকার গঙ্গার তীরের চিৎপুর অঞ্চলে অবস্থিত ‘আদি চিত্তেশ্বরী’  দুর্গামন্দির। কলকাতার বহু প্রাচীন রাস্তা গুলির মধ্যে চিৎপুর রোড উল্লেখযোগ্য। তখনও  শহর ঠিক মতো গড়ে ওঠেনি, এখন যেখানে স্ট্যান্ড রোড, সেখান দিয়েই বইত হুগলি নদী। জঙ্গলাকীর্ণ ওই অঞ্চলে ছিল চিতু ডাকাতের আধিপত্য। কথিত আছে , ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ভেসে আসা এক প্রকান্ড নিম গাছের গুঁড়ি দিয়ে চিতে ডাকাত এই জয়চন্ডী চিত্তেশ্বরী দুর্গা মুর্তি তৈরী করেন।
ডাকাতি করতে যাবার আগে তিনি এই দূর্গামূর্তির আরাধনা করতেন। তার মৃত্যুর পর,  নৃসিংহ ব্রহ্মচারী নামে একজন উপাসক ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ( মতান্তরে ১৫৮৬ ) স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে জঙ্গল থেকে এই মূর্তি উদ্ধার করেন।  অবশ্য এসবই কথকতা , তাই তার সত্যতা সম্পর্কে কোনো লিখিত তথ্য বা প্রমাণ নেই।
PSX_20180223_010351
তবে,  ৯ খগেন চ্যাটার্জি স্ট্রিটের এই দুর্গামন্দিরের দেওয়ালে লাগানো ফলক থেকে জানা যায় বহু কাল আগে, চৈতন্যদেবের অন্যতম শিষ্য বাসুদেব ঘোষের বংশধর এবং বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদ জেলার মধ্যবর্তী কুলাই গ্রামের জমিদার মনোহর ঘোষ এবং তার স্ত্রী ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে কোরিন্থিয়ান থাম ও পেডিমেন্ট সহ , পঙ্খের অলঙ্করণ যুক্ত এই  চিত্তেশ্বরী দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
PSX_20180306_235052
মহন্ত নৃসিংহ ব্রহ্মচারী পর যথাক্রমে তাঁর শিষ্য রামনৃসিংহ ব্রহ্মচারী এবং প্রশিষ্য ক্ষেত্র ব্রহ্মচারী চিত্তেশ্বরী মন্দিরের দায়িত্বভার গ্রহন করেন।
ক্ষেত্র ব্রহ্মচারী পরবর্তীকালে বিয়ে করে সংসারধর্ম পালন করেন। তার বড় মেয়ের যদুমণির বিয়ে হয় এক অশীতিপর বৃদ্ধের সঙ্গে এবং ছোট মেয়ে ক্ষেত্রমণিকে পাত্রস্থ করা হয় বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশে। ক্ষেত্রমণি ও তাঁর স্বামী আনন্দমোহন রায়চৌধুরীর বংশধরেরাই বর্তমানে চিত্তেশ্বরী দুর্গা মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বভার গ্রহন করেছেন।
1520401083312
” আমার গল্পটি ফুরল ” ….. এবার ফেরার পালা,
ফেরার আগে মনভরে মা চিত্তেশ্বরী দুর্গার কয়েকটা ফটো তুলে এনেছি আপনাদের জন্য ।
1520400798244

তথ্য সুত্র-
কলকাতার মন্দির ও মসজিদ-তারাপদ সাঁতারা

Temples in Calcutta – Piyush Kanti Roy

শ্রী গৌতম বসু মল্লিক এবং

ইন্দ্রজিৎ দাস ( BongBlogger)